আমাদেরবাংলাদেশ ডেস্ক।। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ধুলা-বালি পড়ে আর অযত্ন-অবহেলায় জং ধরে অকেজো কয়েক”শ যানবাহন। দেখে মনে হয়,পুরনো যানবাহনের ভাগাড়। নানা জটিলতায় এসব যানবাহনের বেশির ভাগের মালিককেও পাওয়া যায় না। ফলে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যানবাহন।
সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বেশ কয়েকটি থানা চত্বর ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সড়ক দুর্ঘটনা,চোরাই পণ্য, মাদকদ্রব্য বহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ জব্দ করে মোটরসাইকেল, ট্রাক, বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ইত্যাদি। জব্দ করার পর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব যানবাহন অযত্নে পড়ে থাকে থানা চত্বরে। এক পর্যায়ে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
মূলত তিনটি কারণে থানায় জব্দ যানবাহন নষ্ট হচ্ছে- গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে মালিকের না আসা, আদালতের নির্দেশনা ছাড়া এসব যানবাহন নিলামে বিক্রি করতে না পারা এবং থানা কর্তৃপক্ষও জব্দ যানবাহন সম্পর্কে আদালতকে কিছু অবগত না করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন,মালিক না আসায় যানবাহন গুলো বছরের পর বছর থানা চত্বরে পড়ে থাকলেও আইনি জটিলতায় বিক্রিও করা যায় না। মামলার আলামত হিসেবে এগুলো রাখতে হচ্ছে।
ডিএমপির শাহবাগ, রামপুরা, ভাটারা, হাতিরঝিল, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও খিলক্ষেত থানা ঘুরে দেখা গেছে, জব্দ করা এসব গাড়ি থানা চত্বরের বেশির ভাগ অংশ দখল করে রেখেছে। এ কারণে চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে। জব্দ করা এসব গাড়ি রাখার কোনো ছাউনি না থাকায় খোলা আকাশের নিচে সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। অযত্নে খোলা জায়গায় পড়ে থাকা এসব যানবাহনের বেশির ভাগ চেনারও উপায় নেই। ডাম্পিং ও থানা চত্বরে কতসংখ্যক যানবাহন রয়েছে তারও সঠিক তথ্য নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে থানাভেদে কমবেশি ৩০ থেকে ৪০টা রয়েছে। এসব যানবাহনের দাম কয়েক শ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা কর্তৃপক্ষের। আদালতের নির্দেশনা না পাওয়ায় এসব যানবাহন নিলামে বিক্রিও করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ‘আদালত চাইলে পড়ে থাকা গড়িগুলো দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। থানা কর্তৃপক্ষ চাইলেও কিছু করার থাকে না। মামলার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু করতে পারি না। কারণ আলামত হিসেবে যানবাহনগুলো জব্দ করা হয়েছে। আমরা চাই, গাড়িগুলো নিলামে তুলে বিক্রি করে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হোক। কারণ অনেক যানবাহন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে মাটিতে দেবে যাচ্ছে। কিছু যানবাহনের যন্ত্রাংশ খুলে পড়ছে, চুরিও হয়ে যাচ্ছে। ’
আদালত সূত্র জানায়, কোনো দুর্ঘটনায় পর মালিক যদি গাড়ি ফিরে পেতে চান তবে আদালতে আবেদন করেন। আবেদনের পর আদালত থানা পুলিশকে মালিকানার তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলেন। পুলিশ প্রতিবেদন দিলে জব্দ করা গাড়ি মালিককে ফেরত দেওয়া যায় কি না, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিক আদালতে আবেদন করেন না। সূত্র জানায়, কোনো থানা এলাকায় জব্দ করা গাড়ি রাখার জায়গা না থাকলে থানা কর্তৃপক্ষ আদালতকে অবহিত করলে সেগুলো নিলামে বিক্রি কিংবা ধ্বংস করার নির্দেশনা দিতে পারেন। দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থানা কর্তৃপক্ষ সেটি করছে না।
২০০৬ সাল পর্যন্ত জব্দ করা যানবাহনের ডাম্পিং স্টেশন ছিল শাহবাগ থানার আঙিনা। পরে সেটি বাতিল করা হয়। সম্প্রতি ওই থানার পেছনে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েক হাজার গাড়ি পড়ে আছে। জায়গার অভাবে একটির ওপর রাখা হয়েছে আরেকটি প্রাইভেট কার। কোনটি কত বছর আগের তা-ও জানা নেই কর্তৃপক্ষের।
শাহবাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা মাফুজুল হক ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঠিক কতসংখ্যক জব্দ করা গাড়ি রয়েছে এখানে তা বলা যাচ্ছে না। আসলে ঘটনার পর মানুষ ঝামেলা মনে করে এসব যানবাহনের খোঁজ নিতে আসে না। এসব গাড়ির বিষয়ে কোনো নির্দেশনাও নেই। রামপুরা থানায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে এক যুগ আগের গাড়িও রয়েছে, যেগুলো এখন রীতিমতো কঙ্কাল। রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জব্দ করা যানবাহনের বেশির ভাগের বৈধ কাগজপত্র নেই অথবা চোরাই। মামলার আলামত হিসেবে যানবাহনগুলো বছরের পর বছর থানা চত্বরে পড়ে থাকছে। এতে থানা চত্বর সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ’
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হলেও আমাদের কিছু করার নেই। গাড়িগুলো বিভিন্ন মামলার আলামত। আদালত নির্দেশনা না দিলে আমাদের কিছু করার নেই। থানা পুলিশ বলছে,কাগজপত্র না থাকলে কিংবা আদালতে মামলা থাকলে নিষ্পত্তির জটিলতায় বেশির ভাগ মালিক যোগাযোগ করেন না। ফলে আদালতের নির্দেশনা না আসায় মালিককে ফেরত দেওয়া যায় না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) হাফিজ আল আসাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, থানায় পড়ে থাকা গাড়িগুলো মামলার আলামত। আদালতের নির্দেশে এসব গাড়ির নিষ্পত্তি করা হয়। এর বাইরে কিছু করার নেই। যেসব গাড়ির মালিক পাওয়া যায় না, সেগুলোর নিলাম হলে বিক্রি করা যায়।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, চুরি, দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে জব্দ করা যানবাহন সিজার লিস্টের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন এগুলো চলে যায় আদালতের জিম্মায়। থানার মাধ্যমে মালিক এলে আদালতের নির্দেশে সেটি মালিকের জিম্মায় দেওয়া যায়। মূলত বেশির ভাগ সময় মালিক আসেন না। মামলার আলামত হিসেবে থানা কর্তৃপক্ষও এগুলো সরাতে পারে না। এর থেকে বের হতে নতুন পদ্ধতি ভাবা দরকার। আর কিভাবে গাড়িগুলো ব্যবহার করা যায়, তা-ও ভাবতে হবে।
আমাদেরবাংলাদেশ.কম/রাজু